খিজির (আ.) সম্পর্কে ইসলামী ঐতিহ্যে বিভিন্ন গল্প ও বর্ণনা পাওয়া যায়, বিশেষ করে তাঁর অমরত্ব বা দীর্ঘায়ুত্ব সম্পর্কে। এখানে কয়েকটি প্রধান গল্প উল্লেখ করা হলো:
খিজির আ. সম্পর্কে একটি বর্ণনা
খিজির আ. কে নিয়ে ইসলামী ঐতিহ্যে কোনও একমত সিদ্ধান্ত নেই, কারও মতে তিনি নবী, কেউ বলেন রাসুল, আবার কেউ তাঁকে আল্লাহর দাস বা ফেরেশতা হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। তবে, ইসলামী স্কলারদের মতে, খিজির আ. আল্লাহর কাছের একজন বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন, যার কারণে তাঁকে "ওলী" হিসেবে সম্মানিত করা হয়।
এই কাহিনীর মূল উৎস তাবারির ইতিহাস গ্রন্থ (تاريخ الطبري), যার লেখক ছিলেন পারস্যের আবু জাফর মুহাম্মাদ আল জারির তাবারি (৮৩৯-৯২৩ খ্রিস্টাব্দ), যিনি একজন প্রখ্যাত ইসলামি ইতিহাসবিদ ও তাফসিরকারক ছিলেন। তাছাড়া, এই কাহিনী অন্যান্য অনেক ইসলামি গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে, তবে এগুলো সাধারণত আধ্যাত্মিক উপকথা হিসেবে বিবেচিত হয়, তাই কিছু অতিরঞ্জনও থাকতে পারে।
কাহিনীর শুরু
পারস্যের বাদশাহ জুল্কারনাইনের রাজত্বকাল ছিল। তাবারি তাঁর নাম "আফ্রিদুন" উল্লেখ করেছেন। কিছু মানুষ আগে মনে করতেন, এই জুল্কারনাইন হলেন দিগবিজয়ী অ্যালেক্সান্ডার (যাকে পারস্যে সিকান্দার নামে ডাকা হতো), তবে একে আরেকটু খোলাসা করলে, সম্ভবত তিনি রাজা সাইরাসও হতে পারেন। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য একটি আলাদা পর্ব প্রয়োজন।
জুল্কারনাইন বিভিন্ন রাজ্য জয় করে একসময় উত্তরের এক ঠাণ্ডা দেশ পৌঁছান, যেখানে অনেক লোক মারা যেতে থাকে। অবশেষে তিনি একটি শহরে পৌঁছান, যেখানে তাঁকে সম্মান জানানো হয় এবং তিনি কিছু সময়ের জন্য সেখানে অবস্থান করেন।
জীবন পানি (আবে হায়াত)
একদিন, এক লোক বাদশাহের কাছে এসে জানায়, "বাদশাহ! আমি শুনেছি, সমুদ্রের ওপারে এক অন্ধকার দেশ আছে, যেখানে সারাক্ষণ আঁধার থাকে। সেখানে একটি গুহায় ‘আবে হায়াত’ নামক একটি ঝর্ণা রয়েছে। এই পানি খেলে কেউ আর মারা যায় না।" 'আবে হায়াত' মানে 'জীবন পানি' বা 'যে পানি যা অমরত্ব দেয়'।
বাদশাহ সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এই পানির খোঁজে বের হবেন। তাঁর সাথে প্রায় ৪,০০০ যুবক নিয়ে অভিযানে বের হন, তবে তিনি ৪০ বছরের বেশি বয়সী কাউকে সাথে নিতে নিষেধ করেন। তাঁরা একটি দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেন।
গুহা এবং অমরত্বের খোঁজ
জুল্কারনাইন এবং তাঁর দল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এক অন্ধকার রাজ্যে প্রবেশ করেন, যেখানে তারা গুহা খোঁজা শুরু করেন। তাদের অভিযান প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে। একদিন, খাদির এবং ইলিয়াস নামের দুই সদস্য নিজেদের জন্য আলাদা পথে বের হন। তারা গুহার মধ্যে পৌঁছালে, খাদির এক অদ্ভুত ঘটনাবলি দেখতে পান। তিনি একটি মরা মাছ হাতে নিয়ে, এক ঝর্ণার পানি দিয়ে ধোয়ার পর, মাছটি জ্যান্ত হয়ে ওঠে। এটি ছিল ‘আবে হায়াত’ বা জীবনের পানি। বালিয়া সেই পানি পান করেন এবং ইলিয়াসকেও পান করান। সেই পানির মাধ্যমে তাদের আয়ু কিয়ামত পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁরা মৃত্যুর ঊর্ধ্বে চলে যান।
এছাড়া, বালিয়া বা খিজির আ. এর নামের উৎপত্তিও এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। 'খিজির' শব্দটির অর্থ 'চিরসবুজ' বা 'সবুজ হয়ে ওঠা', কারণ বালিয়া যেখানে বসতেন, সে জায়গাটি সবুজ হয়ে উঠেছিল। সেখান থেকে তাঁর নতুন নাম হয়ে যায় 'খিজির' আ.।
জীবন পানি এবং জুলকারনাইনের পরিণতি
পানি পান করে একদিকে যেমন খিজির আ. অমরত্ব লাভ করেন, তেমনি অন্যদিকে, জুল্কারনাইন যখন পানি পান করতে যান, তখন পানির মশক হাত থেকে পড়ে যায় এবং মেঝে শুষে নেয় সমস্ত পানি। তাঁর ভাগ্যে ছিল না সেই অমরত্ব।পানি পান করার আগে তিনি ভেবেছিলেন, "এই আবে হায়াতের পানি যদি আমি একা পান করি, তবে আমি একাই পৃথিবীতে কীভাবে বাঁচব? আমার পরিবার, স্ত্রী, সন্তানদের সাথেই আমি বাঁচতে চাই।" তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যে তিনি একা পান না করে, তাঁর পরিবারের সবাইকে নিয়ে পানি খেতে যাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
খিজির আ. এর পরবর্তী জীবন
এভাবে, খিজির আ. পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। তিনি মুসা আ. এর সময় দেখা দেন, তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর সম্পর্কে ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় নানা গল্প এবং চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। এমনকি অনেক সাহাবী খিজির আ. কে দেখার দাবি করেছেন, যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আবু বকর (রা) এবং আলি (রা)। ইসলামী ইতিহাসে কিছু হাদিস রয়েছে, যেগুলোতে বলা হয়, খিজির আ. প্রতি বছর হজে আসেন এবং রমজান মাসে জেরুজালেমে অবস্থান করেন।
খিজির আ. এর জ্ঞানের উৎস
এছাড়া, অনেক ইসলামি গ্রন্থে একটি কাহিনী আছে, যেখানে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি খিজির আ. কে আল্লাহর প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান দেন। এই বৃদ্ধ ব্যক্তি, শেষ পর্যন্ত নিজেকে ফেরেশতা জিবরাঈল বলে পরিচয় দেন এবং খিজির আ. এর জ্ঞান অর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করেন।
আবে হায়াত ঝর্নার পানি
কিছু গল্পে বলা হয় যে, খিজির (আ.) "অমরত্তের সুধা" বা "আব-ই-হায়াত" পান করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, যার ফলে তিনি দীর্ঘায়ু বা অমর হয়েছিলেন। এই পানির কিংবদন্তি অনেক ধর্মীয় এবং পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু কুরআন বা সাহীহ হাদিসে এই ব্যাপারে সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই। অনেকের মতে, এই গল্পগুলি বিভিন্ন লেখকের নিজস্ব বর্ণনা এবং কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের ভিত্তি নেই।
